Header Ads

ডেঙ্গু জ্বর কী? জ্বরের লক্ষণ ও প্রকার এবং প্রাথমিক চিকিৎসা

ডেঙ্গু জ্বর বাংলাদেশ ভারত সহ দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলে খুবই পরিচিত। এই জ্বরের কারণে প্রতিবছর বিশ্বে হাজার খানেক মানুষের মৃত্যু ঘটে। ডেঙ্গু জ্বরের প্রধান বাহক মশা। বদ্ধ জলাশয় থেকে এই মশারা বংশ বিস্তার করে এবং বিশেষ করে শহরাঞ্চলে বৃদ্ধি লাভ করে। আজকে আমরা ডেঙ্গু জ্বর নিয়ে আলোচনা করবো এবং ডেঙ্গুর প্রাথমিক তথ্যাদি জানার চেষ্টা করবো।

ডেঙ্গু জ্বর কী?

ডেঙ্গু জ্বর একটি ভাইরাসজনিত রোগ, যা ডেঙ্গু ভাইরাস দ্বারা সৃষ্ট এবং প্রধানত এডিস মশা বিশেষ করে এডিস ইজিপ্টাই এবং এডিস অ্যালবোপিকটাস দ্বারা সংক্রমিত হয়। এটি একটি সংক্রামক রোগ, যা গ্রীষ্মমণ্ডলীয় এবং উপ-গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলে সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। বাংলাদেশের ঢাকায় প্রতি বছর ডেঙ্গু জ্বরে শতাধিক ব্যক্তির মৃত্যু ঘটে।

ডেঙ্গু ভাইরাসের বৈশিষ্ট্য:

ডেঙ্গু ভাইরাসের চারটি প্রধান সেরোটাইপ রয়েছে, যা প্রতিটি আলাদা ভিন্নতার প্রতিনিধিত্ব করে। এগুলো হল:

১. DENV-1 (ডেঙ্গু ভাইরাস ১)

এটি ডেঙ্গু জ্বরের একটি সাধারণ সেরোটাইপ এবং সাধারণত হালকা থেকে মাঝারি রোগ সৃষ্টি করে।

DENV-1 সংক্রমণের ফলে তৈরি হওয়া ইমিউনিটি শুধুমাত্র এই সেরোটাইপের জন্য কার্যকরী, অন্য সেরোটাইপের জন্য নয়।

২. DENV-2 (ডেঙ্গু ভাইরাস ২)

DENV-2 অনেক সময় ডেঙ্গু হেমোরেজিক ফিভার এবং ডেঙ্গু শক সিনড্রোমের কারণ হতে পারে।

এই সেরোটাইপটি সাধারণত আরো গুরুতর লক্ষণ এবং জটিলতার সাথে যুক্ত হয়।

৩. DENV-3 (ডেঙ্গু ভাইরাস ৩)

DENV-3 মারাত্মক জটিলতার কারণ হতে পারে, তবে এটি তুলনামূলকভাবে সাধারণত কম গুরুতর লক্ষণ সহ হয়।

এটি সংক্রমণের পর শরীরে প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করে কিন্তু অন্য সেরোটাইপের বিরুদ্ধে নয়।

৪. DENV-4 (ডেঙ্গু ভাইরাস ৪)

DENV-4 সাধারণত ক্লাসিক্যাল ডেঙ্গু জ্বর সৃষ্টি করে এবং অন্যান্য সেরোটাইপের মতো গুরুতর জটিলতা সৃষ্টি করে না।

তবে, এই সেরোটাইপ দ্বারা সংক্রমিত হলে অন্যান্য সেরোটাইপের জন্য আগে প্রাপ্ত ইমিউনিটি একসাথে কাজ করতে পারে এবং তা জটিলতার কারণ হতে পারে।

যদি কেউ একবার ডেঙ্গু ভাইরাসের একটি সেরোটাইপ দ্বারা সংক্রমিত হয়, তবে সে সেই নির্দিষ্ট সেরোটাইপের জন্য ইমিউনিটি পায়, তখন সে ভবীষ্যতে আর কখনও সেই সেরোটাইপ দ্বারা ডেঙ্গুতে সংক্রমিত হয় না, কিন্তু অন্যান্য সেরোটাইপ দ্বারা সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকি থেকে যায়।

ডেঙ্গু জ্বরের প্রকার:

ডেঙ্গু জ্বর সাধারণত তিনটি প্রধান ধরণের হতে পারে। প্রতিটি ধরণের লক্ষণ এবং জটিলতা ভিন্ন হতে পারে। এগুলো হল:

১. ক্লাসিক্যাল ডেঙ্গু জ্বর (Classical Dengue Fever)

লক্ষণ: উচ্চ জ্বর, তীব্র মাথাব্যথা, চোখের পিছনে ব্যথা, পেশী এবং অস্থি ব্যথা, ত্বকে ফুসকুড়ি, বমি বমি ভাব, এবং ক্লান্তি।

জটিলতা: এই ধরণের ডেঙ্গু জ্বর সাধারণত হালকা থেকে মাঝারি লক্ষণের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে এবং কিছুদিনের মধ্যে স্বাভাবিকভাবে সেরে ওঠে।

প্রচলিত নাম: একে মাঝে মাঝে "ব্রেকবোন ফিভার"ও বলা হয়, কারণ এতে পেশী এবং হাড়ের ব্যথা খুব তীব্র হয়।

২. ডেঙ্গু হেমোরেজিক ফিভার (Dengue Hemorrhagic Fever - DHF)

লক্ষণ: ক্লাসিক্যাল ডেঙ্গু জ্বরের সকল লক্ষণসহ রক্তক্ষরণ (নাক থেকে, মাড়ি থেকে, অথবা শরীরের অন্য কোনো অংশ থেকে), ত্বকে ছোট লাল দাগ, প্লাটিলেট সংখ্যা কমে যাওয়া, এবং রক্ত জমাট বাঁধার সমস্যা।

জটিলতা: এই ধরণের ডেঙ্গু মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে এবং অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণের ঝুঁকি থাকে। রোগীকে দ্রুত চিকিৎসা না দেওয়া হলে এটি বিপজ্জনক হতে পারে।

৩. ডেঙ্গু শক সিনড্রোম (Dengue Shock Syndrome - DSS)

লক্ষণ: তীব্র পেটের ব্যথা, দ্রুত শ্বাস-প্রশ্বাস, ঠাণ্ডা হাত-পা, এবং রক্তচাপ খুব কমে যাওয়া (হাইপোটেনশন)। ক্লাসিক্যাল এবং হেমোরেজিক ডেঙ্গুর সব লক্ষণের সাথে শক বা ধকল দেখা দেয়।

জটিলতা: এটি ডেঙ্গুর সবচেয়ে বিপজ্জনক ধরণ। দ্রুত এবং সঠিক চিকিৎসা না দিলে এটি প্রাণঘাতী হতে পারে।

ডেঙ্গু জ্বরের কারণ:

ডেঙ্গু জ্বরের কারণ হল ডেঙ্গু ভাইরাস, যা এডিস মশার মাধ্যমে মানব দেহে প্রবেশ করে। এখানে ডেঙ্গু জ্বরের কারণ এবং এর সংক্রমণের প্রক্রিয়া সম্পর্কে কিছু বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরা হল:

ডেঙ্গু ভাইরাস:

ভাইরাসের ধরন: ডেঙ্গু ভাইরাসটি একটি RNA ভাইরাস, যা ফ্লাভিভাইরিডি পরিবারের অন্তর্ভুক্ত। এটি প্রধানত চারটি সেরোটাইপের (DENV-1, DENV-2, DENV-3, DENV-4) মাধ্যমে সংক্রমিত হয়।

মশার মাধ্যমে সংক্রমণ: ডেঙ্গু ভাইরাস সাধারণত এডিস ইজিপ্টাই এবং এডিস অ্যালবোপিকটাস প্রজাতির মশার কামড়ের মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করে।

সংক্রমণের প্রক্রিয়া:

মশার কামড়: মশা কামড়ানোর সময় ডেঙ্গু ভাইরাস আক্রান্ত মশা থেকে রক্তের সাথে ভাইরাসের অংশ প্রবাহিত হয়।

অন্ত্রে প্রবেশ: ভাইরাস রক্তের মাধ্যমে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রতঙ্গে ছড়িয়ে পড়ে, বিশেষ করে শরীরের রক্তনালী এবং ইমিউন সিস্টেমের কোষে।

ইনকিউবেশন পিরিয়ড: সংক্রমণের পর ৪-১০ দিনের মধ্যে ভাইরাসের লক্ষণ প্রকাশিত হতে শুরু করে।

ডেঙ্গু জ্বরের লক্ষণ:

ডেঙ্গু জ্বরের লক্ষণ সাধারণত সংক্রমণের ৪ থেকে ১০ দিনের মধ্যে প্রকাশিত হয় এবং এগুলো হালকা থেকে তীব্র হতে পারে। এখানে ডেঙ্গু জ্বরের লক্ষণগুলো উল্লেখ করা হলো:

সাধারণ লক্ষণ:

উচ্চ জ্বর: হঠাৎ করে ১০৪° ফারেনহাইট (৪০°C) বা তার বেশি তাপমাত্রা বৃদ্ধি।

মাথাব্যথা: বিশেষ করে কপালের দিকে তীব্র মাথাব্যথা।

চোখের পিছনে ব্যথা: চোখের পিছনে এবং চারপাশে ব্যথা অনুভূত হতে পারে।

পেশী ও অস্থি ব্যথা: তীব্র পেশী এবং হাড়ের ব্যথা, যা "ব্রেকবোন ফিভার" নামে পরিচিত।

দুর্বলতা: ক্লান্তি বা দুর্বলতা বোধ করা।

বমি বমি ভাব: বমি, বমি বমি ভাব বা ক্ষুধামান্দ্য।

ত্বকে ফুসকুড়ি: ত্বকে লালচে ফুসকুড়ি দেখা দিতে পারে, যা সাধারণত জ্বর শুরু হওয়ার কয়েক দিনের মধ্যে ঘটে।

গুরুতর লক্ষণ (DHF/DSS):

ডেঙ্গু হেমোরেজিক ফিভার (DHF) বা ডেঙ্গু শক সিনড্রোম (DSS) হলে, নিচের লক্ষণগুলো দেখা যেতে পারে:

রক্তক্ষরণ: নাক, মাড়ি, বা শরীরের অন্য কোনো স্থান থেকে রক্তপাত।

প্লাটিলেট সংখ্যা কমে যাওয়া: রক্তের প্লাটিলেটের সংখ্যা হ্রাস।

শরীরে ফুসকুড়ি: ত্বকে ছোট ছোট লাল দাগ (petechiae) এবং অন্যান্য রক্তক্ষরণের লক্ষণ।

তীব্র পেটের ব্যথা: পেটে তীব্র ব্যথা অনুভূত হতে পারে।

শ্বাসকষ্ট এবং ঠাণ্ডা হাত-পা: রক্তচাপ হঠাৎ কমে গেলে শ্বাসকষ্ট এবং ঠাণ্ডা হাত-পা অনুভূতি।

ডেঙ্গু জ্বরের চিকিৎসা:

ডেঙ্গু জ্বরের জন্য কোনো নির্দিষ্ট চিকিৎসা বা অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ নেই। চিকিৎসা মূলত লক্ষণ নিরাময়ের দিকে মনোযোগ দেয় এবং রোগীর পরিস্থিতি অনুযায়ী চিকিৎসা করা হয়। এখানে ডেঙ্গু জ্বরের চিকিৎসার কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরা হলো:

লক্ষণ নিরাময়:

যন্ত্রণানাশক ওষুধ: প্যারাসিটামল (অ্যাসিটামিনোফেন) ব্যবহার করা যেতে পারে জ্বর এবং ব্যথা কমানোর জন্য। অ্যাসপিরিন বা নন-স্টেরয়েডাল অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি ড্রাগ (NSAIDs) যেমন ইবুপ্রোফেন এড়িয়ে চলা উচিত, কারণ এগুলো রক্তক্ষরণের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

পর্যাপ্ত তরল গ্রহণ:

হাইড্রেশন: রোগীকে পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি, স্যালাইন, বা অন্যান্য তরল (যেমন ইলেকট্রোলাইট দ্রব্য) গ্রহণ করতে দেওয়া উচিত। এটি শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখতে সাহায্য করে এবং ডিহাইড্রেশন প্রতিরোধ করে।

পর্যবেক্ষণ:

চিকিৎসকের পরামর্শ: ডেঙ্গু জ্বরের লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যাওয়া উচিত। গুরুতর অবস্থায় (যেমন DHF বা DSS) হাসপাতালে ভর্তি করা হতে পারে, যেখানে নিয়মিত রক্ত পরীক্ষা ও পর্যবেক্ষণ করা হবে।

বিশ্রাম:

বিশ্রাম: রোগীকে বিশ্রাম নিতে বলা উচিত, কারণ এটি শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে।

জটিলতা এড়ানো:

রক্তের প্লাটিলেটের সংখ্যা পর্যবেক্ষণ: ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে প্লাটিলেটের সংখ্যা মনিটর করা গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষ করে যদি DHF বা DSS এর লক্ষণ দেখা দেয়। চিকিৎসক প্রয়োজন অনুযায়ী রক্ত পরীক্ষা এবং চিকিৎসা করবেন।

হাসপাতালে ভর্তি:

গুরুতর ডেঙ্গু জ্বরের ক্ষেত্রে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া জরুরি হতে পারে, যেখানে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা এবং পর্যবেক্ষণ প্রদান করা হবে।

ডেঙ্গু জ্বরের সঠিক চিকিৎসা জানার পাশাপাশি মশার কামড় থেকে সুরক্ষা নেওয়া এবং মশার প্রজননস্থল দূর করা জরুরি। ডেঙ্গু জ্বরের লক্ষণ দেখা দিলে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

কোন মন্তব্য নেই

Blogger দ্বারা পরিচালিত.